আল্লাহ তায়ালার
সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘আশরাফুল মখলুকাত’ হলো মানুষ। মানুষ ভাষা দ্বারা মনের
ভাব প্রকাশ করতে পারে এবং একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। মানুষের
পরিচয় বা সংজ্ঞায় আরবিতে বলা হয়, ‘হায়ওয়ানুন নাতিক’, অর্থাৎ
‘বাক্শক্তিসম্পন্ন প্রাণী’।
ভাষা বা বর্ণে নয়, কর্মেই পরিচয়
সব
মানুষ একই পিতা-মাতার সন্তান। সবারই পিতা বাবা আদম আলাইহিস সালাম, সবারই
মাতা মা হাওয়া আলাইহাস সালাম। সাদা-কালো, লম্বা-খাটো—সে তো আল্লাহর সৃষ্টি।
বর্ণবৈষম্য, ভাষাবৈষম্য এবং ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক পার্থক্য মানুষে মানুষে
কোনো ভেদাভেদ সৃষ্টি করে না। কোরআনে করিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘হে মানুষ!
আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে, পরে তোমাদের বিভক্ত
করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অন্যের সঙ্গে পরিচিত হতে
পারো। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে
তোমাদের মধ্যে বেশি মুত্তাকি। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু জানেন, সব খবর রাখেন।
(সুরা-৪৯ হুজুরাত, আয়াত: ১৩, পারা: ২৬, পৃষ্ঠা: ১৬-৫১৮)।
সব নবী-রাসুল স্বজাতির ভাষাভাষী ছিলেন
মহানবী
হজরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন: ‘তিন কারণে তোমরা আরবিকে ভালোবাসো; যেহেতু
আমি আরবি, কোরআন আরবি এবং জান্নাতের ভাষাও হবে আরবি।’ (বুখারি)। সর্বশেষ
আসমানি কিতাব ফুরকান বা কোরআন আরবি ভাষায় সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত
মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রতি নাজিল করা হয়েছে।
বিদায় হজের ভাষণে নবী
করিম (সা.) বলেছেন: ‘কালোর ওপর সাদার প্রাধান্য নেই, অনারবের ওপর আরবের
শ্রেষ্ঠত্ব নেই।’ (বুখারি শরিফ)। সুতরাং কোনো ভাষাকে হেয়জ্ঞান করার অবকাশ
নেই, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার সুযোগ নেই ও অবহেলা করার অধিকার নেই। কেননা,
ভাষার স্রষ্টা মহান আল্লাহ। তাঁর সৃষ্টির অবমূল্যায়ন করা তাঁর প্রতি
অসম্মান প্রদর্শনেরই নামান্তর। আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘আমি প্রত্যেক রাসুলকেই
তাঁর স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি তাঁদের কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা
করার জন্য।’ (সুরা-১৪ ইবরাহিম, আয়াত: ৪, পারা: ১৩, পৃষ্ঠা: ১৪-২৫৬)।
মহাগ্রন্থ
আল কোরআন আরবি ভাষায় নাজিল করার কারণ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ
তায়ালা স্বয়ং ব্যাখ্যা প্রদান করেন এভাবে: ‘আমি অবতীর্ণ করেছি আরবি ভাষায়
কোরআন, যাতে তোমরা বুঝতে পারো।’ (সুরা-১২ ইউসুফ, আয়াত: ২, পারা: ১২,
পৃষ্ঠা: ১৪-২৩৬)। আরবদের কাছে আরবি কিতাব আল কোরআন নাজিল করা হয়েছে। কারণ,
তাদের মাতৃভাষা আরবি; অন্য ভাষায় নাজিল করলে তাদের বুঝতে এবং অনুসরণ করতে
অসুবিধা হতো।
ভাষার বিশুদ্ধতা রক্ষা করা সুন্নত
শুদ্ধ ভাষা ও
সুন্দর বর্ণনার প্রভাব অনস্বীকার্য। আমাদের প্রিয় রাসুল (সা.) ছিলেন
‘আফছাহুল আরব’ তথা আরবের শ্রেষ্ঠ বিশুদ্ধ ভাষী। সুতরাং বিশুদ্ধ মাতৃভাষায়
কথা বলা নবীজি (সা.)-এর সুন্নত। কোরআনুল করিমের বর্ণনা: ‘দয়াময় রহমান
আল্লাহ! কোরআন পাঠ শেখালেন; মনুষ্য সৃজন করলেন; তাকে ভাষা বয়ান শিক্ষা
দিলেন।’ (সুরা-৫৫ আর রহমান, আয়াত: ১-৪, পারা: ২৭, পৃষ্ঠা: ১০-৫৩২)।
ভাষাচর্চা
ইবাদত। আরবি ভাষার ব্যাকরণ মুসলমানদের হাতেই রচিত হয়। অনারবদের কোরআন পড়তে
সমস্যা হতো বিধায় হজরত আলী (রা.) তাঁর প্রিয় শাগরেদ হজরত আবুল আসওয়াদ
দুওয়াইলি (রা.)-কে নির্দেশনা দিয়ে আরবি ভাষাশাস্ত্র প্রণয়ন করান, যা ইলমে
নাহু ও ইলমে ছরফ নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে উচ্চতর ভাষাতত্ত্ব ইলমে বায়ান,
ইলমে মাআনি ও ইলমে বাদির উন্নয়ন ঘটে; যার পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন ইমাম
আবদুল কাহির জুরজানি (রা.) ও ইমাম জামাখশারি (রা.)।
শেখ আবদুর রহমান
জামি (রা.) পারস্যবাসী হয়েও বিশ্বের সেরা আরবি ব্যাকরণের তাত্ত্বিক
বিশ্লেষণ গ্রন্থ শারহে জামি (ফাওয়ায়িদে জিয়াইয়া) রচনা করেন, যা শাফিয়া
গ্রন্থের প্রণেতা ইমাম ইবনে হাজিব (রা.) প্রণীত কাফিয়া গ্রন্থের ব্যাখ্যা। এ
গ্রন্থের আরও জগদ্বিখ্যাত বিশেষণ পুস্তক রয়েছে; সুওয়ালে কাবুলি, সুওয়ালে
বাসুলি, তাহরিরে চম্বট ইত্যাদি এর অন্যতম।
সাহিত্যচর্চাও ইবাদত
সুসাহিত্য
রচনাও ইবাদত। আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘হে নবী (সা.), আমি আপনার প্রতি সর্ব
সুন্দর কাহিনি বর্ণনা করেছি।’ (সুরা-১২ ইউসুফ, আয়াত: ২, পারা: ১২, পৃষ্ঠা:
১৪-২৩৬)। প্রিয় নবী (সা.) নিজে কাব্য করতেন। বিখ্যাত সাহাবি হজরত হাসসান
বিন সাবিত (রা.) কাব্য রচনা করতেন। হজরত আয়িশা (রা.) কাব্যচর্চা করতেন।
এভাবে ইসলামের সব যুগেই বিভিন্ন ভাষায় সাহিত্যচর্চা চলে আসছে।
সত্য প্রচার ও দাওয়াতি কাজে ভাষার প্রভাব
আল্লাহ
তায়ালা মানুষের হিদায়াতের জন্য নবী-রাসুলদের পাঠিয়েছেন। সব নবী-রাসুলের
ধর্ম প্রচারের প্রধান মাধ্যম ছিল দাওয়াত তথা মহা সত্যের প্রতি আহ্বান। আর
এর জন্য ভাষার কোনো বিকল্প নেই। আল্লাহ তায়ালা হজরত মুসা (আ.)-এর প্রতি অহি
নাজিল করলেন; তাঁকে নবী ও রাসুল হিসেবে ঘোষণা করলেন; তাঁর প্রতি তাওরাত
কিতাব অবতীর্ণ করেন, তখন তিনি তাঁর ভাই হজরত হারুন (আ.)-কে নবী ও রাসুল
হিসেবে ঘোষণা করার জন্য আল্লাহর সমীপে আরজ করলেন। কারণ, তিনি ছিলেন বাগ্মী,
শুদ্ধ ও স্পষ্টভাষী সুবক্তা, আর মুসা (আ.)-এর মুখে ছিল জড়তা।
মুসা
(আ.) কারণ হিসেবে বলেছেন, ‘সে আমা অপেক্ষা বাক্পটু’। কোরআন করিমে এই
বর্ণনাটি এভাবে উপস্থাপিত হয়েছে: মুসা (আ.) বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক!
আমার সিনা প্রশস্ত করে দিন এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। আমার ভাষার জড়তা দূর
করে দিন, যাতে তারা আমার কথা বুঝতে পারে। আমার জন্য একজন সাহায্যকারী
বানিয়ে দিন আমার স্বজনদের মধ্য থেকে; আমার ভাই হারুনকে; তার দ্বারা আমার
শক্তি সুদৃঢ় করুন এবং তাকে আমার (দাওয়াতি-প্রচার) কাজের শরিকদার করুন, যাতে
আমরা আপনার পবিত্রতা ও মহিমা বেশি বেশি বর্ণনা করতে পারি এবং আপনাকে অধিক
স্মরণ করতে পারি; আপনি তো আমাদের সর্বতো প্রত্যক্ষকারী।’ (সুরা-২০ তহা,
আয়াত: ২৫-৩৬, পারা: ১৬, পৃষ্ঠা: ১২-৩১৪)।
আমাদের ভাষারা ইতিহাস
৮ই ফাল্গুন বাঙালি জাতির
চির প্রেরণা ও অবিস্মরণীয় একটি দিন। এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, এখন এটি সারা
বিশ্বের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।
জাতির
জীবনে শোকাবহ, গৌরবোজ্জ্বল, অহংকারে মহিমান্বিত চিরভাস্বর এই দিনটি। ১৯৫২
সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল ঔপনিবেশিক প্রভুত্ব ও শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে
বাঙালির প্রথম প্রতিরোধ এবং জাতীয় চেতনার প্রথম উন্মেষ।
সেদিন
মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রাখতে গিয়ে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল রফিক,
জব্বার, সালাম, বরকত ও সফিউররা। পৃথিবীর ইতিহাসে মাতৃভাষার জন্য রাজপথে
বুকের রক্ত ঢেলে দেয়ার প্রথম নজির এটি। সেদিন তাদের রক্তের বিনিময়ে
শৃঙ্খলযুক্ত হয়েছিল দুঃখিনী বর্ণমালা ও মায়ের ভাষা। আর এর মাধ্যমে বাঙালি
জাতিসত্তা বিকাশের যে সংগ্রামের সূচনা হয়েছিল তা মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় পথ
বেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে।
১৯৯৯
সালে ইউনেস্কো কর্তৃক বাংলাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃত এবং
২০১০ সালে জাতিসঙ্গের সাধারণ পরিষদ ‘এখন’ থেকে প্রতিবছর ৮ই ফাল্গুন
আন্তর্জাতিক মার্তৃভাষা দিবস হিসাবে পালিত হবে’ প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে
গৃহীত হয়।
ভাষা আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেমের প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক
সংগঠন তমদ্দুন মজলিশের হাত ধরে। ১৫ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিশ একটি পুস্তিকা
প্রকাশ করে যার শিরোনাম ছিল ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা বাংলা-না উর্দু ?’
এই পুস্তিকার লেখক কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমেদ এবং অধ্যাপক আবুল
কাশেম বাংলা ভাষাকে ভাববিনিময়, অফিস আদালতের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার
পক্ষে জোরালো দাবি তুলে ধরেন।
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান
গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজিকে সরকারি ভাষা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। গণপরিষদে
পূর্ব বাংলার প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ
মানুষের ভাষা হিসেবে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে গণপরিষদের ভাষা
হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব করেন। পাকিস্তান গণপরিষদে তার প্রস্তাব
আগ্রাহ্য হলে পূর্ব বাংলায় শুরু হয় প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ।
এর পরম্পরায়
২৭ ফেব্রুয়ারি এক সভায় গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। সভায় বাংলা
ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবিতে ১১ মার্চ বৃহস্পতিবার
সারা দেশে হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ১১
মার্চ তারিখটি রাষ্ট্রভাষা দিবসরূপে পালিত হয়।
২১ মার্চ ১৯৪৮ সালে
রেসকোর্স ময়দানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এক নাগরিক সংবর্ধনায় ঘোষণা করেন যে
‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ সমাবেশস্থলে উপস্থিত
ছাত্রনেতারা ও জনতা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে।
২৪ মার্চ ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মুহাম্মদ আলী
জিন্নাহ ‘Students Role in nation building’ শিরোনামে একটি ভাষণ প্রদানকালে
ক্যাটাগেরিক্যালি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিকে
নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে একটি এবং সেটি উর্দু,
একমাত্র উর্দুই পাকিস্তানের মুসলিম পরিচয় তুলে ধরে।’
জিন্নাহর এই
বক্তব্য সমাবর্তনস্থলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং ছাত্ররা দাড়িয়ে
‘‘নো নো’’ বলে প্রতিবাদ করে। জিন্নাহর এই বাংলাবিরোধী স্পষ্ট অবস্থানের ফলে
পূর্বে পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলন আরো বেশি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।
ভাষা
আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ের সূচনা হয় ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা
নাজিমুদ্দীনের ভাষণের মাধ্যমে। এদিন পল্টন ময়দানের এক জনসভায় জিন্নাহর কথাই
পুনরাবৃত্তি করে বলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু’।
নাজিমুদ্দীনের
বক্তৃতার প্রতিবাদে সভা এবং ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালন করে।
সেদিন ছাত্র-নেত্রীরা আমতলায় সমবেত হয়ে ৪ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ও প্রতিবাদ সভা
এবং ২১ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী হরতাল পালনের সিদ্দান্ত নেয়। পরে তারা মিছিল
নিয়ে বর্ধমান হাউসের দিকে অগ্রসর হয়।
পরদিন ৩১ জানুয়ারি ১৯৫২ সালে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার লাইব্রেরি হলে অনুষ্ঠিত সভায় মাওলানা ভাসানীর
সভাপতিত্বে কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে ৪০ সদস্যের ‘সর্বদলীয়
কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মী পরিষদ গঠিত হয়’। এই পরিষদ তার সভায় ২১
ফেব্রুয়ারি হরতালের, সমাবেশ ও মিছিলের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে।
২০
ফেরুয়ারি সরকার স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকায় এক
মাসের জন্য সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে। ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিভিন্ন হলে সভা করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত
নেয়।
২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী সকাল ৯টা
থেকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এসে
জড়ো হয়। তারা ১৪৪ ধারা জারির বিপক্ষে স্লোগান দিতে থাকে এবং পূর্ববঙ্গ আইন
পরিষদের সদস্যদের বাংলা ভাষা সম্পর্কে সাধারণ জনগণের মতামতকে বিবেচনা করার
আহ্বান জানাতে থাকে। বেলা ২টার দিকে আবদুল মতিন এবং গাজীউল হকসহ অন্যান্য
নেতারা দাবি আদায়ে অনড় থাকে।
ছাত্ররা ছোট ছোট দলে মিছিল নিয়ে
‘রাষ্টভাষা বাংলা চাই’ স্লোগান দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলে পুলিশ তাদের ওপর
লাঠিচার্য করে। এমনকি ছাত্রীরাও এ আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি। ছাত্রছাত্রীরা
পুলিশের দিকে ইটপাটকেল ছোড়া শুরু করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
পুলিশ বিক্ষুদ্ধ ছাত্রদের সামলাতে ব্যর্থ হয়ে গণপরিষদ ভবনের দিকে অগ্রসরমাণ
মিছিলের ওপর পুলিশ গুলি চালায়।
গুলিতে আব্দুল জব্বার রফিক উদ্দিন
আহমেদ ও আবুল বরকত নিহত হয়। বহু আহতকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় । ছাত্র
হত্যার সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে জনগণ তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়ে। উপায়ন্তর না
দেখে ২২ ফেব্রুয়ারি নুরুল আমিন সরকার তড়িঘড়ি করে আইন পরিষদ বাংলা ভাষাকে
পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব
আনেন এবং প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে পাস হয়।
১৯৫৪ সালের ৭ মে
যুক্তফ্রন্ট সরকারের উদ্যোগে পাকিস্তানের সরকার বাংলাকে একটি রাষ্ট্রভাষা
হিসেবে স্বীকার করে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ সালে
পাকিস্তানের গণপরিষদ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে তা
সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রস্তাব উত্থাপন করার জন্য প্রস্তাব
উত্থাপিত হয়।
১৯৫৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান জাতীয় সংসদ বাংলা
এবং উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধান পাস
করে। ওই বছরের ৩ মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানকারী
পাকিস্তানের সংবিধান কার্যকর হয় এবং ১৯৪৭ সালে তমদ্দুন মজলিশের মাধ্যমে
মায়ের ভাষায় কথা বলার যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তার সাফল্য অর্জিত হয়।
৮ই ফাল্গুন দিনটি উদযাপন করা শুরু হয় ১৯৫৩ সাল থেকে। এদিন প্রত্যুষে
সর্বস্তরের মানুষ খালি পায়ে প্রভাতফেরিতে অংশগ্রহণ করে এবং শহীদ মিনারে
গিয়ে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে। সারা দিন মানুষ শোকের
চিহ্নস্বরূপ কালো ব্যাজ ধারণ করে। এছাড়া আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
ইত্যাদির মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন